BLANTERTOKOSIDEv102
6217215329334371520

বাংলা ফন্ট ফাউন্ড্রি

আমার সোনার বাংলা

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥

ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,

মরি হায়, হায় রে—

ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি॥

কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো—

কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।

মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,

মরি হায়, হায় রে—

মা, তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা, আমি নয়নজলে ভাসি॥

তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,

তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।

তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে,

মরি হায়, হায় রে—

তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি॥

ধেনু-চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে,

সারা দিন পাখি-ডাকা ছায়ায়-ঢাকা তোমার পল্লীবাটে,

তোমার ধানে-ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,

মরি হায়, হায় রে—

ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে–

আমি পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ ব'লে গলার ফাঁসি॥

বঙ্গমাতাকে উদ্দেশ্য করে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পূর্ণ কবিতাটি তুলে ধরেছি তবে, এই কবিতার প্রথম ১০ লাইন আমাদের জাতীয় সঙ্গিত হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমাদের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গিত "আমার সোনার বাংলা" বঙ্গমাতা সম্পর্কে গানটির কথা লিখেছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পরবর্তীতে গানটির সুর নেওয়া হয়েছে গগন হরকরা বা গগনচন্দ্র দাসের "কোথায় পাবো তারে" গানটি থেকে। তবে এই কথা, এই সুর, এই গান কেবলকি এতেই সীমাবদ্ধ? আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি এক মহাকাব্যের পাদদেশে, যে মহাকাব্যের নাম বাংলাদেশ! এই সুর, এই গান আমাদের মুক্তিপাগল বাংলার সন্তানদের রক্তে আগুন ধরিয়েছিল। এই মন্ত্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে মৃত্যুকে জয় করার সাহস জুগিয়েছিল। সেই ইতিহাস শুধু অক্ষরের নয়, সেই ইতিহাস লাখো হৃদয়ের রক্তক্ষরণের! চলুন কিছুক্ষণের জন্য সেই দিনগুলোতে সেই মুহূর্তে ফিরে চলা যাক যখন বাংলার আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা, যখন ঘরে ঘরে স্বজনের লাশ, আর পথে পথে বুটের শব্দ। সেই ঘোর অন্ধকারের মাঝে, যখন জাতির আশা ফুরিয়ে আসছিল, ঠিক তখনই এক অমর সুর বেজে উঠল বাংলার প্রতিটি প্রান্তরে, প্রতিটি শহীদের কানে! সেই গানটিই ছিলো "আমার সোনার বাংলা"! এটা তো শুধু কয়েকটি পঙ্‌ক্তি নয়, এটি ছিল আমাদের জন্মভূমির প্রতি, আমাদের সবুজ-শ্যামল মাটির প্রতি, আমাদের নদী-ধানখেতের প্রতি এক বুকভরা ভালোবাসা আর প্রতিজ্ঞার অগ্নিশপথ। এই গানটির প্রতিটি ছত্রে মিশে ছিল পান্তা ভাতে লবণ, কাচা পেয়াজ আর মরিচ ডলে খেয়ে পরিশ্রম করা প্রতিটি বঙ্গমাতা প্রেমী মানুষের! যখন আমাদের বীর যোদ্ধারা অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছিলেন, যখন মা-বোনেরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন, যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে পালাচ্ছিলেন তখন এই গানটিই ছিল তাদের শেষ আশ্রয়; মাথা তুলে ওঠার জন্য বাঙালির আজন্ম অমর শ্রেষ্ঠ স্লোগান। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে যখন এই সুর ভেসে আসতো, তখন সেই সুর গোলার বারুদের শব্দকেও ছাপিয়ে যেত! বিশ্বাস করুন, মুক্তিযোদ্ধারা যখন হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তাদের কানে শত্রুর বুলেটের শব্দ নয় বরং তাদের রক্তে বাজতো এই গানের সুর! এই যেমন ধরুন "ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে..." এই কথাগুলো শুনে একজন মুক্তিযোদ্ধার মনে পড়তো তার ফেলে আসা মা, তার শৈশবের ফাল্গুন, তার গাঁয়ের মেঠোপথ। আর তখনই তার রক্ত টগবগ করে উঠতো, তার চোখে জ্বলে উঠতো ইস্পাতের ন্যায় কঠিন প্রতিজ্ঞা! সে ভাবতো, এই মাটি আমার মায়ের শাড়ির আঁচল! এই মাটির অসম্মানকারী, শাসনের নামে শোষণ করা বর্গিদের আমি কিছুতেই ছাড়তে পারি না! এই গান ছিল সেই ঐক্য ও সংকল্পের বীজ, যা ১৯৭১ সালের ৩'রা মার্চ প্রথম উন্মুক্ত জনসভায় জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ঘোষিত হলো, এবং পরে মুজিবনগর সরকার কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হলো। এটি প্রমাণ করেছিল, আমাদের স্বাধীনতা শুধু সামরিক যুদ্ধ নয়, এটি ছিল সাংস্কৃতিক এবং আত্মিক মুক্তির যুদ্ধ! মুক্তিযুদ্ধ। আজও যখন এই গানটি বেজে ওঠে, তখন আমার চোখে ভেসে ওঠে সেই লক্ষ প্রাণের বলিদান, সেই নদীর মতো বয়ে যাওয়া রক্ত আর সেই অবর্ণনীয় ত্যাগের ইতিহাস! সালাম জানাই সেই সুরকে, যে সুর আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃসময়ে আমাদের শক্তি জুগিয়েছিল। এই গান চিরকাল আমাদের মুক্তি এবং স্বাধীনতার অনন্ত প্রতীক হয়ে থাকবে। জয় বাংলা! বাংলাদেশ চিরজীবী হোক!

-মোঃ মাহিন মাহমুদ দিপ্র।